মৌলভীবাজার জেলার শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশে নাট্যকলা ও সংগীতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে সম্মাননা পেলেন শ্রীমঙ্গলের দুই কৃতি সন্তান— নাট্যজন মোঃ দেলোয়ার হোসেন ও কণ্ঠশিল্পী তারেক ইকবাল চৌধুরী। সম্প্রতি মৌলভীবাজার জেলা শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হয় ‘গুণিজন সম্মাননা–২০২৩’।
১৯৭৯ সালে শ্রীমঙ্গল উপজেলার সিরাজনগর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন নাট্যজন দেলোয়ার হোসেন। তাঁর পিতা মোঃ আব্দুল হেকিম ও মাতা হালিমা বেগম। ছোটবেলা থেকেই সংস্কৃতি ও সাহিত্যচর্চায় আগ্রহী দেলোয়ার ছাত্রজীবনে নাটকের প্রতি অনুরাগী হয়ে ওঠেন। ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি ও বিএ পাস করে তিনি সিলেটের মুরারিচাঁদ বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন।
ছাত্রাবস্থায়ই নাটকের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্নে উদ্বুদ্ধ হয়ে ১৯৯৪ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন নাট্যসংগঠন ‘বিজয়ী থিয়েটার’। শুরুর দিনগুলিতে ছিল সীমিত পরিসর, কিন্তু লক্ষ্য ছিল বৃহৎ— শিল্পের মাধ্যমে মানুষের চেতনায় আলো ছড়ানো। বর্তমানে তিনি এই সংগঠনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দেলোয়ার হোসেন শুধু একজন নির্দেশক নন, তিনি একজন নাট্যকারও। তাঁর লেখা ও নির্দেশনায় মঞ্চস্থ হয়েছে বহু দর্শকপ্রিয় নাটক, যার মধ্যে রয়েছে— মহাজনের খেলা, তিনখান কথা, আশরাফুল মাখলুকাত, ঘটক সম্প্রদায়, একজন মুক্তিযোদ্ধার স্বপ্ন, মায়ের সমাধি এবং বধ্যভূমি ৭১।
তাঁর নাটকগুলোতে উঠে আসে সমাজের বাস্তব চিত্র, মানবিক সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। মঞ্চের বাইরে থেকেও তিনি সক্রিয়ভাবে সংস্কৃতি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। সম্মিলিত নাট্য পরিষদ, জেলা নাট্য পরিষদ, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন ও বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের সদস্য হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন ধরে সাংস্কৃতিক আন্দোলনে কাজ করে যাচ্ছেন। করোনা মহামারির সময়ে তিনি অসহায় শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, শিশুদের জন্য উদ্যানের মুক্তমঞ্চ নির্মাণ করেছেন এবং তরুণদের নাটক ও খেলাধুলার মাধ্যমে মাদকমুক্ত জীবনের পথে উদ্বুদ্ধ করেছেন। স্থানীয় পর্যায়ে নাট্যচর্চার প্রসারে তাঁর অবদান আজ শ্রীমঙ্গলের সংস্কৃতি অঙ্গনে এক প্রেরণার নাম।
অন্যদিকে, সংগীতের ভুবনে সমানভাবে আলো ছড়াচ্ছেন শ্রীমঙ্গলের পরিচিত কণ্ঠশিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মোঃ তারেক ইকবাল চৌধুরী। তাঁর সংগীতচর্চা শ্রীমঙ্গলের সংস্কৃতি অঙ্গনকে শুধু সমৃদ্ধ করেনি, বরং একদল তরুণ শিল্পীকে অনুপ্রেরণার জোয়ারে ভাসিয়েছে। তিনি বর্তমানে হাছন রাজা লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
দীর্ঘদিন ধরে তিনি যুক্ত আছেন শ্রীমঙ্গল শিল্পী কল্যাণ সংস্থা, সম্মিলিত নাট্য পরিষদ, সম্মিলিত নৃত্য পরিষদ এবং উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর মতো সংগঠনের সঙ্গে। এসব সংগঠনে সভাপতি ও সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি সাংগঠনিক দক্ষতা ও নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁর কণ্ঠে সুর মিশে থাকে আবেগ ও দেশপ্রেমের, যা মঞ্চে, রেডিওতে বা বিভিন্ন উৎসবে শ্রোতাদের মুগ্ধ করে রাখে।
বিভিন্ন জাতীয় দিবস ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে নিয়মিত গান পরিবেশন করে তিনি দর্শক-শ্রোতার ভালোবাসা অর্জন করেছেন। তাঁর পরিবেশনায় দেশপ্রেম, মানবতা ও সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসার বার্তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গুণিজন সম্মাননার জন্য মনোনীত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি লেখেন— “কৃতজ্ঞতা রইল জুড়ি বোর্ড এবং বাছাই কমিটির প্রতি। আমার মতো এতো নগণ্য একজন শিল্পীকে গুণী শিল্পী হিসাবে মনোনীত করায়। আজ থেকে মনে হয় দায়িত্ব আরো বেড়ে গেল।” তাঁর এই বিনয়ই প্রমাণ করে তিনি শুধু গায়ক নন, বরং একজন নিবেদিত সাংস্কৃতিক মানুষ।
শ্রীমঙ্গলের সাংস্কৃতিক কর্মীরা মনে করেন, জেলা শিল্পকলা একাডেমির এই স্বীকৃতি কেবল ব্যক্তিগত সম্মান নয়— এটি শ্রীমঙ্গলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি এক গৌরবময় স্বীকৃতি। নাট্যকলার মঞ্চে দেলোয়ার হোসেন যেমন আলো জ্বালিয়ে রেখেছেন, সংগীতের মঞ্চে তেমনি সুরের ভুবনে হৃদয় ছুঁয়ে যাচ্ছেন তারেক ইকবাল চৌধুরী। তাঁদের সম্মাননা প্রমাণ করে, শিল্পের শক্তি এখনও সমাজে জীবন্ত, আর শ্রীমঙ্গল আজও সংস্কৃতির উর্বর ভূমি।