বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নব্বইয়ের দশকের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রতিভাবান নায়ক ছিলেন সালমান শাহ। তার পূর্ণ নাম শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন। ১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটের জিন্দাবাজারে জন্ম নেওয়া এই অভিনেতা ছোটবেলা থেকেই অভিনয় ও সংগীতের প্রতি গভীর আগ্রহী ছিলেন। ১৯৯৩ সালে চলচ্চিত্র ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ দিয়ে বড় পর্দায় আত্মপ্রকাশের পরই তিনি হয়ে ওঠেন দর্শকের প্রিয় মুখ। মাত্র তিন বছরের স্বল্প ক্যারিয়ারে ২৭টিরও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে সালমান শাহ ঢালিউডে আনেন আধুনিকতার ছোঁয়া। তার ফ্যাশন, সংলাপের ভঙ্গি ও ব্যক্তিত্ব নব্বইয়ের দশকের তরুণ সমাজে সৃষ্টি করে এক নতুন ধারা।
জীবনের উজ্জ্বল অধ্যায় হঠাৎ থেমে যায় ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সকালে, যখন ঢাকার এসকাটন রোডের নিজ বাসায় সালমান শাহকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। মাত্র ২৪ বছর বয়সে এই জনপ্রিয় তারকার এমন অকাল মৃত্যুতে স্তব্ধ হয়ে যায় গোটা দেশ। প্রাথমিকভাবে পুলিশ ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করলেও তার পরিবার—বিশেষ করে মা নীলা চৌধুরী—শুরু থেকেই দাবি করে আসছেন এটি একটি পরিকল্পিত হত্যা। পরবর্তীতে তার পিতা “অস্বাভাবিক মৃত্যু” মামলা দায়ের করেন, যা পরে “হত্যা মামলা” হিসেবে গৃহীত হয়।
দীর্ঘ ২৯ বছর পর অবশেষে সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের হলো হত্যা মামলা। আদালতের নির্দেশে মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে তার সাবেক স্ত্রী সামিরা হককে। পাশাপাশি ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই, লতিফা হক লুসি, চলচ্চিত্রের খলনায়ক ডনসহ মোট ১১ জনকে আসামি করা হয়েছে। সোমবার (২০ অক্টোবর) মধ্যরাতে রাজধানীর রমনা মডেল থানায় মামলাটি দায়ের করেন সালমান শাহর মামা আলমগীর কুমকুম। এর আগে একই দিন ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক সালমান শাহর মৃত্যুকে ‘অপমৃত্যু’ নয়, বরং ‘হত্যা’ হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে পুনঃতদন্তের নির্দেশ দেন।
পিবিআই তাদের প্রতিবেদনে সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন বলে মত দিলেও পরিবার তা মানতে অস্বীকৃতি জানায়। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, তদন্তে শুরু থেকেই দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও অবহেলা ছিল। সেই মন্তব্যের ভিত্তিতেই মামলাটি পুনরায় খতিয়ে দেখা শুরু হয়।
মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পরেও সালমান শাহ রয়েছেন অম্লান। তার অভিনীত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’, ‘অনন্ত ভালোবাসা’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘অন্তরে অন্তরে’ আজও নতুন প্রজন্মের কাছে সমানভাবে প্রিয়। বাংলা চলচ্চিত্রে তিনি কেবল এক নায়ক নন, বরং একটি সময়, একটি অনুভূতি ও এক প্রজন্মের চিরন্তন প্রতীক।