
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেয়াদবিহীন পাউরুটি, নি¤œমানের কলা এবং পরিমাণে কম খাবার সরবরাহের অভিযোগ উঠেছে মেসার্স তুলী এন্টারপ্রাইজ নামে হাসপাতালে খাদ্য সরবরাহকারী ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।
রবিবার (৩১ মে) ৫০শয্যা বিশিষ্ট শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সকালের নাশতা হিসেবে রোগীদের মাঝে মেয়াদবিহীন পাউরুটি, নিন্মমানের কলা এবং পরিমাণে কম খাবার সরবরাহ করার তথ্য পাওয়া গেছে।
ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করছেন রোগীদের খাবারের জন্য বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে মানসম্মত খাবার নিশ্চিত করা হচ্ছে না। খাবার সরবরাহে অনিয়ম ও তদারকির ঘাটতির কথাও উল্লেখ করেন তারা। সরকারি হাসপাতালে রোগীদের খাবার সরবরাহে এমন অবহেলা এবং অনিয়মের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী ও তাদের স্বজনরা। এ ঘটনায় হাসপাতালজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সচেতনমহল এবং স্থানীয়দের মধ্যেও তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, রোগীদের জন্য যে খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে তা প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুণ থেকে বঞ্চিত এবং অত্যন্ত নিম্নমানের। রোগীদের স্বজনরা জানান, একজন অসুস্থ মানুষের জন্য পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার অত্যন্ত প্রয়োজন। কিন্তু হাসপাতালে যে খাবার দেওয়া হচ্ছে, তা রোগীদের শারীরিক অবস্থার সঙ্গে মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সরেজমিনে হাসপাতালে গেলে চিকিৎসাধীন ডায়েরিয়ার রোগী আব্দুর রহমান অভিযোগ করে বলেন, আমি ডায়েরিয়া নিয়ে গতকাল থেকে হাসপাতালে ভর্তি। এখানে সকালে নাশতা হিসেবে আমাকে মেয়াদবিহীন একটি পাউরুটি ও পঁচা কলা দেওয়া হয়েছে। পাউরুটি মুখে দেওয়ার পর দুর্গন্ধে আমার মুখে বমি চলে আসছে। পরে এটি না খেয়ে রেখে দিয়েছি। পাউরুটির পেকেটে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সিল বা কোনো তারিখ নেই। আর কলাও ছিল খুবই নিন্মমানের। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানাই। কিন্তু ততক্ষণে অনেক রোগী ওই পাউরুটি খেয়ে ফেলেছেন।
ফয়সল নামে এক শিশুর স্বজন অভিযোগ করে বলেন, আমার ৪ বছরের শিশুকে নিয়ে এখানে ভর্তি। রবিবারের সকালে আমাদের শিশু ওয়ার্ডে থাকা প্রতিটি রোগীকে এক পিস করে নি¤œমানের কলা এবং মেয়াদবিহীন পাউরুটি দেওয়া হয়েছে। অথচ পার্শ্ববর্তী ওয়ার্ডে দুই পিস করে কলা দেওয়া হয়েছে। এমন অনিয়ম হাসপাতালে চলছে। দিপালী নামে এক চা শ্রমিক অভিযোগ করে বলেন, সকালের নাশতা হিসেবে একটি কলা এবং সিল ও তারিখবিহীন বনরুটি পেয়েছি।
নিম¥মানের খাবার এবং পরিমানে কম দেওয়ার অভিযোগসহ হাসপাতালের ভর্তিকৃত রোগীরা নার্স-স্টাফদের দায়িত্ব-কর্তব্যে অবহেলা, বাথরুম অপরিস্কার, পানি সংকটসহ নানা অব্যবস্থার অভিযোগ তুলেছেন।
এদিকে গতকাল দুপুরে হাসপাতালের মেডিকেল অফিসারের কক্ষে গিয়ে দেখা হয় জরুরি বিভাগের মেডিকেল অফিসার ডা. নিশাত নাওয়াল মুমু এর সাথে। এসময় তাকে মেয়াদবিহীন পাউরুটির ছবি দেখালে তিনি বলেন, আমি দায়িত্বরত অবস্থায় একজন আমাকে এ বিষয়ে অভিযোগ দিয়ে গেছেন। আমি বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।
জানতে চাইলে মেসার্স তুলী এন্টারপ্রাইজের সত্ত¡াধিকারী পাকিজ মিয়া বিষয়ে সত্যতা স্বীকার করে বলেন, এটা ঠিক আজকের পাউরুটিতে উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণ তারিখ ও সিল ছিল না। লোকাল বেকারী থেকে পাউরুটি সংগ্রহ করে হাসপাতালে সরবরাহ করা হয়েছে। কলা প্রথমে এক পিস দেওয়া হলেও পরে দুই পিস করে দেওয়া হয়েছে। কলা আগের দিন কেনার কারণে কিছুটা নষ্ট হতে পারে। তবে আগামী দিনগুলো মানসম্মত সকল খাবার সরবরাহ করা হবে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, একটি সরকারি হাসপাতালে রোগীদের মেয়াদবিহীন খাবার সরবরাহের অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সরকারি অর্থে পরিচালিত হাসপাতালগুলোর খাবারের মান নিয়ে নিয়মিত মনিটরিং না থাকায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি রোগীদের নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করাও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
এ বিষয়ে শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সিনথিয়া তাসমিন বলেন, নিন্মমানের কলা দেওয়ার বিষয়টি জানার পর তাৎক্ষণিক পরিবর্তন করে দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের বলা হয়েছে। পরিমাণে কম এবং মেয়াদবিহীন বিষয়টি আমার জানা নেই।
আমি হাসপাতালে এসে এসব বিষয়ে খোঁজ নিয়ে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনে শোকজ করা হবে। অন্যান্য অভিযোগগুলোও তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ জিয়াউর রহমান বলেন, নিম্নমান তথা মেয়াদবিহীন খাদ্য পরিবেশন কোথাও কাম্য নয়; হাসপাতালে তো একেবারেই না। হাসপাতালে আগত রোগী ও সেবাগ্রহীতার স্বার্থে এখানে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পরিবেশন করাই সমীচীন ও আবশ্যক। আমি ইউএইচএফপিও শ্রীমঙ্গলসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে আলোচনা করে এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের চেষ্টা করবো।