একদিকে বাজারে এক কাপ চায়ের দাম ১০ টাকা, অন্যদিকে কৃষকের এক কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৮ থেকে ৯ টাকায়। উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে আলু বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় চরম হতাশায় পড়েছেন রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার আলুচাষিরা। লোকসানের বোঝা টানতে টানতে অনেকেই এখন দিশেহারা।
তারাগঞ্জ উপজেলার প্রামাণিকপাড়া গ্রামের কৃষক আনারুল ইসলাম বলেন, “এক কেজি আলু বেচে এক কাপ চা হয় না। তবু ক্রেতা নাই। গত বছর আলুতে ২ লাখ টাকা লস করেছি। এবারও যদি লস হয়, পথে বসতে হবে।”
উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত বছর উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে ৪ হাজার ৫৩০ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছিল। এতে উৎপাদন হয় ১ লাখ ৪২ হাজার ৯৫ মেট্রিক টন আলু। কিন্তু তারাগঞ্জে তিনটি হিমাগারের মোট ধারণক্ষমতা মাত্র ১৬ হাজার টন। ফলে বাকি ১ লাখ ২৮ হাজার ৯৫ টন আলু কৃষকেরা বাড়িঘর, উঠান ও অস্থায়ী গুদামে সংরক্ষণ করেন। পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধা না থাকায় অনেক আলু পচে যায় এবং বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করতে হয়। অনেকের পক্ষেই হিমাগারের ভাড়া বহন করা সম্ভব হয়নি।
কৃষি বিভাগ জানায়, গত বছরের তুলনায় এ বছর আলুর আবাদ কিছুটা কমে ৩ হাজার ৪৬৩ হেক্টরে নেমে এসেছে। তবে মৌসুমের শুরুতেই বাজারদর উৎপাদন খরচের নিচে নেমে যাওয়ায় চাষিরা বিপাকে পড়েছেন। সার, বীজ, সেচ ও শ্রমিকের মজুরি মিলিয়ে প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে গড়ে ১৬ থেকে ১৭ টাকা খরচ হলেও বাজারে দাম পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৮ থেকে ৯ টাকা।
বামনদীঘি গ্রামের কৃষক সোনা মিয়া জানান, চলতি মৌসুমে এক একর জমি ইজারা নিতে হয়েছে ৩২ হাজার টাকায়। চাষাবাদে খরচ হয়েছে— উপখাদ্য সাড়ে ৬ হাজার, বীজ ৫০ হাজার, রোপণের শ্রমিক ৪ হাজার ৮০০, রাসায়নিক সার ১৩ হাজার ৬০০, আলু বাঁধা ৮ হাজার ৪০০, সেচ ও শ্রমিক ৪ হাজার, ওষুধ ও স্প্রে শ্রমিকসহ ১৬ হাজার এবং আলু উত্তোলনে ৯ হাজার ৬০০ টাকা। সব মিলিয়ে তাঁর মোট খরচ হয়েছে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৬০০ টাকা। এক একরে প্রায় ৯ হাজার কেজি আলু উৎপাদন হওয়ায় প্রতি কেজিতে গড় খরচ দাঁড়িয়েছে ১৬ টাকার বেশি।
সোনা মিয়া বলেন, “গত বছর দাম না পেয়ে গুদামে রেখে এসেছি। এবারও দাম অর্ধেকের মতো। কী হবে আল্লাহ ভালো জানেন।”
আলুচাষিদের দাবি, ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণ, সরকারি ক্রয় কার্যক্রম চালু এবং হিমাগারের ধারণক্ষমতা বাড়ানো না হলে প্রতিবছরই তাঁদের লোকসানের এই চক্রে পড়তে হবে।
সরকারপাড়া গ্রামের চাষি সাইদুল ইসলাম বলেন, “এত কষ্ট করে আবাদ করিয়াও যদি দাম না পাই, তাহলে বাঁচব কেমন করে? মনে হয় আলুর আবাদই বাদ দিতে হবে।”
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ধীবা রানী রায় বলেন, বাজার পরিস্থিতি ও সংরক্ষণ সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। গত বছরের তুলনায় আবাদ কম হলেও এ বছর উৎপাদন ভালো হয়েছে।
মন্তব্য করুন