২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হয়। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শুরু হলেও পরবর্তীতে তা সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে বৃহত্তর সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয়। আন্দোলনের সময় রাজনৈতিক দলগুলোর বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীও নানাভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন।
আন্দোলনের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান, সহিংসতা, ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ও কারফিউ পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। ১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হওয়ার ঘটনা আন্দোলনে নতুন গতি আনে এবং দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এরপর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কোটা সংস্কারের দাবি থেকে সরে এসে সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করে।
৪ আগস্টের সংঘাতের পর ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে লাখো মানুষ অংশ নেয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করেন। এর মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের টানা প্রায় ১৬ বছরের শাসনের অবসান ঘটে এবং পরবর্তীতে একটি অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ অভ্যুত্থান শুধু কোটা আন্দোলনের ফল ছিল না; বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংকট, দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন, ভোটাধিকার নিয়ে বিতর্ক এবং শাসনব্যবস্থা নিয়ে জনঅসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ ছিল। তাঁদের মতে, দেশের তরুণ প্রজন্ম পরিবর্তনের দাবিকে জাতীয় পর্যায়ে নিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
পরবর্তী সময়ে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠিত হয় এবং রাষ্ট্র সংস্কার, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার আলোচনা নতুন গতি পায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকীর মতে, বিপ্লব-পরবর্তী সময় সব দেশেই চ্যালেঞ্জপূর্ণ হলেও শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, কর্তৃত্ববাদ থেকে গণতান্ত্রিক ধারায় প্রত্যাবর্তন এবং রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে জাতীয় আলোচনা শুরু হওয়াই অভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। তাঁর মতে, রাষ্ট্র সংস্কার একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া এবং তা ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নেওয়াই ভবিষ্যতের বড় চ্যালেঞ্জ।